ইহুদি সম্প্রদায় : বর্তমান পৃথিবীর সুপারপাওয়ার (পর্ব ৩)
ইহুদি সম্প্রদায় : বর্তমান পৃথিবীর সুপারপাওয়ার (পর্ব ৩)
ইহুদিদের নিয়ে দুর্বল হোসেন বাতাসের জনপ্রিয় লেখা ইহুদি সম্প্রদায় : অত্যাচারিত থেকে অত্যাচারী : বর্তমান পৃথিবীর শাসক ও সুপারপাওয়ার থেকে সংকলিত । ইহুদিদের ইতিহাস জানুন, এদের থেকে সতর্ক থাকুন।

২য় পর্বের পর............
ইহুদিরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইসলাম বিষয়ক এক্সপার্ট তৈরির জন্য। ২০০২-২০০৩ সালের বাজেটে আমেরিকা “ ইসলাম বিষয়ক এক্সপার্ট ” তৈরির জন্য বরাদ্দ করেছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা গণচীনের পূর্ণ সামরিক বাজেটের সমান। এই টাকায় বাংলাদেশের একুশ বছরের বাজেট সংকুলান হয়। এতোগুলো টাকা শুধু এক্সপার্ট তৈরির জন্য এবং গবেষণার জন্য। কী গবেষণা হয় এবং কী করে এক্সপার্টগণ ? তারা তৈরি করে সুইসাইড বম্বার। তাদের সুইসাইড বম্বার হিসেবে আত্মঘাতী বোমা ফাটানোর কাজটি করছে এক “ তরুণী ”! । তরুণীরা কেন ?!
ইসরাইল সাহাক,
অধ্যাপক, জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক প্রেসিডেন্ট,
ইসরেলি লীগ ফর হিউম্যান এন্ড সিভিল রাইটস্
ইসরাইল সাহাক (Israel Shahak) - এর লেখা হতে জানা যায় ( তিনি জেরুজালেম পোষ্টে লিখে থাকেন; হিব্রু সংস্করণে; কমই তার ইংলিশ প্রতিবেদন ছাপা হয় )। এই লেখাটি ১৯৮৫ সনের। তরুণীদের ধরে নিয়ে যায় ইসরেলি সেনাবাহিনীর লোকজন। তারপর তাকে বিবস্ত্র করা হয়। ছবি তোলা হয় বিভিন্ন পোজের। তারপর তাকে গণধর্ষণ করা হয়। এ অবস্থায় তরুণীটি যখন ভগ্ন হৃদয় এবং মর্মাহত, - তখন তার পিতা, ভাই অথবা এমন কোন সম্পর্কের, যার সঙ্গে বিবাহ চলে না - এমন কোনো ব্যক্তিকে ধরে এনে কৃত্রিম উপায়ে (ইনজেকশান বা মুখে খাওয়ার ঔষুধ) প্রচন্ডভাবে যৌনাবেগ সৃষ্টি করে রাখা হয়। তারপর বাধ্য করা হয় তাকে রেপ করার জন্য। অনিচ্ছায়, অজ্ঞানতায় “ রেপ ” করার কাজটির তুলে রাখা হয় অজস্র ছবি। তারপর “ সেট করা ” নাটকের অংশ হিসেবে তাকে উদ্ধার করে নেয় ইহুদি রাবাঈদের ( Jewish Rabbi ) কেউ। নাটকের অংশ হিসেবে তৈরি হয়ে আছে এমন “ মুসলমান ” সংগঠনের কাছে করা হয় হস্তান্তর । সেই মুসলমানরূপী ইহুদিরা বুঝিয়ে দেয় - এ জীবন আর রেখে কী হবে, খোদার জন্য শত্রু ঘায়েল করে শহীদ হয়ে যাও। উপদেশটি সৎ মনে হয়। গায়ে জড়িয়ে নেয় বোমা - সেই তরুণীটি। তাকে টার্গেট দেয়া হয় কোথায় যাবে, কে সাহায্য করবে, - এইসব। টার্গেট জানানো হয় “সেনাবাহিনী ”, কারণ, তাদের প্রতিই তরুণীটির বিদ্বেষ। কিন্তু, বাসে উঠার পর কিংবা বাজার এলাকায় গমন করার পর টিপে দেয়া হয় রিমোর্ট কন্ট্রোল। কেবল সাধারণ নিরপরাধ ইহুদি জনগণই মরে সুইসাইড বোমায়, কখনও সেনাবাহিনীর একটি সদস্যেরও কিছু হয় না। দু’ঘন্টার মধ্যে “ পোট্রেট কোয়ালিটির ” ছবি চলে যায় টেলিভিশনে। পূর্বেই ছবি রাখা হয়েছিল তার; নাম, ঠিকানা সব নির্ভুল। জগৎ শুনেছে, মুসলমান তরুণীর সুইসাইড বোমায় অনেকজন ইসরেলি নিরপরাধ জনগণ মারা হয়েছে। এ-লেখাটি যখন রচিত হয়, তখন (অক্টোবর ০৩) ইসরেল সিরিয়া আক্রমন করে সুইসাইড বোমা হামলার প্রতিবাদে। ১৯ জন ইসরেলি নাগরিক মারা গেছে। সেখানেও ছিল এমনি দুর্ভাগ্যের শিকার এক তরুণী। “সুইসাইড বোমা ” ইসলামের আদর্শকে বিশ্বের সামনে অনেক নিচু করেছে। তার অর্থ এই নয় যে সব সুইসাইড বোমা বর্ণিত পদ্ধতিতে ঘটে। মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত উচ্ছ্বাসে তা করে থাকে। এর পেছনে যে অদৃশ্য যোগান, উৎসাহ-উদ্দীপনা, অর্থ, সুযোগ, উপকরণ - এসবের পেছনে আছে, সেই ৩৫ বিলিয়ন ডলারের সমর্থন। ব্যবহৃত হয় নির্বোধ মুসলমান - যারা মূলতঃ কোরআন বিচ্ছিন্ন।
২০০২-২০০৩ সালে চীনের সামরিক বাজেট ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার যার পরিমাণ মাত্রাটি বড় হয়ে গেছে বলে আমেরিকা চীনের উপর আপত্তি তুলেছিল। অথচ, আগেই বলেছি , একই বছর আমেরিকা ইসলাম বিষয়ক গবেষণা ও এক্সপার্টিজ এর জন্য যে বাজেট করেছে তার পরিমাণও ৩৫ বিলিয়ন ডলার। কি হয়েছে আমেরিকার? সারা পৃথিবীতে শত ধর্ম রয়েছে, আর কারো বিষয়ে নয় - শুধু মুসলমানদের বেলায় তাদের এতটা যত্ন নেয়ার প্রয়োজন হয় কেন? যদিও এর উত্তরটি বিশাল তবু তার মূল " কিং ডেভিডের কিংডম অব ইসরাঈল " প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী জায়নবাদী ব্যবস্থার মূলে প্রোথিত। ইহুদীরা অর্থের মালিক। ইহুদীরা ইসলামের চিরশত্রু । ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ। ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনের অন্য অর্থ হলো ইরাকে ইহুদিদের ভাড়াটে শক্তির আগ্রাসন। জন্মগতভাবেই তাদের মধ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা আর ঘৃণার প্রেষণা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। এই প্রেষণায় তাড়িত হয়ে তারা দুনিয়াময় যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে যাবে। (৫:৬৪)। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ ঘরে বাইরে। ঘরের যুদ্ধে ইহুদীদের ভাড়াটে সৈনিক হলো আজকের শহর কেন্দিক আধ্যাত্মিক সূফী সাধকের গোষ্টি। ওরা ইহুদিদের এজেন্ট। ওরা সাধক নয়, ওরা চর (Spy) এবং চোর । ওরা সূফী নয়, ওরা অর্থলোভী ভোগসেবী, চরিত্রহীন, প্রবঞ্চনাকারী শয়তানের প্রকাশ্য পুত্র। এই " সূফী সাধকরা " ইসলামের সর্বনাশ ঘটায়। মুসলমানদের সাধারণ জ্ঞানেই বুঝবার কথা যে, সুফী সাধকগণ নির্লোভ, নির্জনতা-প্রিয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমান সূফী সাধকরা ডিশ এন্টেনার যাবতীয় অনুষ্ঠান উপভোগকারী, এক্সরেটেড ভিডিও (Porn Movie) দর্শক, শহর কেন্দ্রিক প্রচার বিলাসী ও ভোগপ্রিয়। ওরা যা সৃষ্টি করেছে তা হলো ফিতনা। ফিতনা হলো ফ্যাসাদের জন্মদাতা। বিলাশবহুল গাড়ীতে চড়ে নবী (সাঃ) আচার ও আদর্শের শিক্ষা দেয়। যে নবী ৮ হাত x ১২ হাতের কুঁড়ে ঘরে জীবন ব্যয় করলেন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করলেন, সে নবীর আদর্শ কাদের দ্বারা এবং কী উপায়ে প্রচার হচ্ছে?
ইসলামের ছদ্মবেশে নতুন ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা
মির্জা মোহাম্মদ কাদিয়ানী
কাদিয়ানী একটি সম্প্রদায় যারা ইসলামের পরিচয় ও পোশাকে ইসলাম ধ্বংসের জন্য এক অতি শক্তিশালী ইহুদি হাতিয়ার। কাদিয়ানীরা ইহুদিদের স্বজাতিসম। ইহুদিদের মতই তারা কোরআন বিকৃতির সার্বিক প্রচেষ্টা করেছে। ইহুদিদের সাথে তাদের পার্থক্য হলো - ইহুদিরা যেখানে তৌরাত পরিবর্তন করে নিজেদের মনগড়া বক্তব্যের সংযোজন দ্বারা তৌরাতকে “ ওল্ড টেস্টামেন্টে ” পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে, সেখান কাদিয়ানীরা তা পারেনি। ইহুদি প্রভাবে আমেরিকা মুসলমান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরি ও গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। ২০০২-২০০৩ সালে তাদের এই বাজেট ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। সীমাহীন অর্থ। এই বিপুল অর্থের একটি বড় সুবিধাভোগী দলের নাম কাদিয়ানী। ইসলামের আবরণে ইসলামের ভাষায় ইসলামের সুরে ইসলামের সর্বনাশের এরা জীবন্ত প্রত্যয়। ইসলামের দেশে ইসলামের বেশে এরা মুসলমান বেশধারী ইহুদি। কাদিয়ানীরা যেভাবে তাদের মতবাদের প্রসার ঘটানোর কার্য করে বেড়ায়, খৃস্টানরা অনুরূপভাবে অর্থ, প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দিয়ে দরিদ্র মুসলমানকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত করে চলছে অতীত হতে।
ইসলামের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে হিজরতের পর। ইসলামের শেষ নবী চিরাচরিত কিবলা মক্কাকে পিছনে ফেলে দীর্ঘ ১৭ মাস মসজিদুল আকসাকে কিবলা ঘোষণা করেন এবং সে অনুসারে নিজে এবং অনুসারিগণ তথা সমস্ত মুসলমান মসজিদুল আকসার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন। ইহুদি-খৃষ্টান মূলত মুসলমানদের এই প্রতিশ্রুত নতুন আইনেরই আওতাভূক্ত এক অভিন্ন জাতি; তাদের মূল ইসলামের আদি সত্তায় প্রোথিত এবং নামে ইহুদি ও খৃষ্টান হলেও তাদের আত্মার উৎস রয়েছে ইসলামে এবং নতুন অবতীর্ণ কোরআনের সাথে - এই সংবাদ তাদেরকে এই কেবলা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এর মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলো বনি ইসরাঈল। বনি ইসরাঈল অস্বীকার করেছে ঈসা (আঃ)-কে। তৌরাতের সাথে কোরাআনের সম্পর্কের বিষয়ে তারা পূর্ব হতেই অবগত এবং অপর পক্ষে খৃষ্টানগণ তাদেরই তৌরাতকে তাদের পুস্তকের অংশ হিসেবে মান্য করে। সুতরাং বনি ইসরাঈলের ঈমান আনয়ন খৃষ্টান ও অপরাপর পৌত্তলিকদের প্রভূতভাবে সাহায্য করতে পারে। বনি ইসরাঈল (এবং খৃষ্টানগণও) বিশেষভাবে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্ম ও আগমনের বিষয়ে পূর্বাহ্নেই অবগত ছিলো। তারা নবীজী (সাঃ)-এর আগমন প্রতীক্ষায় মক্কায় ও ইয়াসরিবে (মদীনায়) দলে দলে ভিড় জমিয়েছিলো। আল্লাহপাক তাদের এই পূর্ব আয়োজন ও প্রস্তুতিকে কোরআনের বাণীতে মোহরান্কিত করে রেখেছেন - “ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে অবশ্যই ইহার (কোরআন) উল্লেখ আছে। (২৬:১৯৬)। বনি ইসরাঈলের পণ্ডিতগণ পূর্বাহ্ণেই ইহা অবগত আছে - ইহা কি উহাদিগের জন্য নিদর্শন নহে?” (২৬:১৯৭)
ইহুদিরা অত্যন্ত আত্মাভিমানি জাতিতে পরিণত হয়ে যায়। তারা দাম্ভিকতায় পৃথিবীতে যারপরনাই বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে। তাদের দাম্ভিক প্রত্যাশা ছিলো - শেষ নবী তাদের বংশেই এবং ইহুদি ঔরসেই জন্ম নেবেন। বনি ইসরাঈলের এই দাম্ভিকতার কারণ ছিল যে ইতিহাসের শক্তিশালী নবীগণ তাদের মধ্যে এসেছে সুতরাং তারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি, আল্লাহ পাকের একমাত্র পছন্দপাত্র জাতি হিসেবে তারা পৃথিবীতে চির উন্নত। ইসরাঈলের বাইরে স্বর্গীয় দয়া নেই এবং শেষ নবী যা তৌরাতে বহুল প্রতিশ্রুত, সে নবীর জন্ম তাদের ভিন্ন অন্য কোন জাতিতে নয়।
অথচ ইতোমধ্যেই তারা হয়ে পড়েছে সীমা লংঘনকারী। যখন তারা দেখলো যে দিনক্ষণের নির্ধারিত জন্মটি ইহুদি পরিবারে নয়, একটি আরব পরিবারে, তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। শেষ নবীর আগমন নিয়ে মাতামাতি কেটে যায় কিন্তু সমস্যার সূচনা হয় কেবল যখন মুহাম্মদ (সাঃ) নবুয়তের বাণী প্রচার শুরু করেন। তারা মুহাম্মদুর রসুল (সাঃ)-কে অস্বীকার করে। আল্লাহপাক ঘটনাটি কোরআনে লিপিবদ্ধ করে দেন - “ উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা তাহাদের আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে উহা এই যে, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন, ঈর্ষান্বিত হইয়া তাহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তাহারা ক্রোধের পাত্র হইল। (২:৯০)
ইহুদিদের রোষানল নবীজী (সাঃ)-কে বিভিন্ন হত্যা-ষড়যন্ত্রের শিকার করলো যদিও আল্লাহপাক প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁর রাসুলকে প্রয়োজনীয় তথ্য পূর্বাহ্ণেই অবগত করেছিলেন এবং নিরাপত্তা বিধান করলেন। কিন্তু ইহুদিদের প্রতি আল্লাহপাকের করুণার দরজা বন্ধ করার পূর্বে নবীজী (সাঃ) কর্তৃক কিবলা পরিবর্তন ছিল এক বিশেষ ও সর্বশেষ ছাড়। ইহুদীরা এই শেষ সুঝোগটুকু গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহপাক কিবলাকে আবার কাবা ঘরের দিকে প্রবর্তন করেন। এই ঘটনা ইহুদী জাতির প্রতি ইসলামের উন্মুক্ত দরজাকে রুদ্ধ করে দেয়। তারা হয়ে পড়ে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত জাতি। তাদের বিষয়ে আল্লাহপাক কোরআনে সুস্পষ্ট ফয়সালা প্রকাশ করেন- “ অতঃপর আমি বনি ইসরাঈলকে বলিলাম- পৃথিবীতে তোমরা বসবাস করিতে থাক এবং যখন তোমাদের প্রতি আল্লাহর শেষ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হইবে তখন তিনি তোমাদের সকলকে “ফিইফা”-তে একত্রিত করিবেন”। (১৭:১০৪)
কী এই “ফিইফা”, কী এই “শেষ প্রতিজ্ঞা”? এ কী শেষ বিচারের প্রতিশ্রুতি এবং তাদের (ইহুদিদের) একত্রিকরণ, না-কি তার বাইরে অন্য কিছু?
প্রকৃতপক্ষে, এই আয়াতের সঠিক অধ্যয়ন ইহুদী সমস্যার চরিত্র বুঝতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। আমরা আয়াতখানি বুঝতে চেষ্টা করবো।
কোরআনের কোন সূরা যেভাবে সন্নিবদ্ধ করা হয়েছে সেভাবে কখনোই অবতীর্ণ হয়নি। বিশেষভাবে বড় সূরাগুলি। সময় ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে এক অভিনব পদ্ধতিতে। আজ একটি সূরার দু’টি আয়াত, কাল অন্য একটি সূরার পাঁচটি আয়াত, অনেকদিন পর অপর একখানি আয়াত যা অন্য একটি সূরার অন্তর্ভূক্ত, অনেকদিন পর হয় তো অন্য কোন একখানি আয়াতাংশ যা অপর কোন সূরার কিংবা পূর্বের কোন সূরার অংশ। এইভাবে ঝিগ্ঝাগ্ (Zigzag), মানবীয় শৃঙ্খলা হতে অতি ভিন্ন এবং ধারণার সাধ্যের অতীত এক পদ্ধতিতে মোট ২৩ বছরের বিস্ময়কর কোরআন, বিস্ময়কর অভিনবতায়, বিস্ময়কর সত্যে বিস্ময়করভাবে বিশ্বের বিস্ময়কর পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর মানুষ মুহাম্মদ(সাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়। যিনি এই বিশাল গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন একবারে এবং যার কোন দ্বিতীয় খসড়ার প্রয়োজন পড়েনি এবং যাতে একটি ভুলের ঘটনা ঘটেনি সেই বিশাল গ্রন্থের (মানবীয় দৃষ্টিত) প্রণেতা কিংবা সন্নিবেশকারী মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একজন ইতিহাস স্বীকৃত নিরক্ষর উম্মী! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় - “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করিলাম” (৫:৩)। এই বাণীটুকু একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র অবতীর্ণ বাণী যা বিদায় হজ্জে নবীজী (সাঃ) যখন উপস্থিত জনতার সাক্ষী গ্রহণ করার পর আকাশের দিকে তাকালেন- ঠিক তখনই তা অবতীর্ণ হয়েছিলো এইটুকুতেই। কিন্তু কোরআনে তা স্থান পেল এক বিস্ময়কর ভঙ্গিতে - তার পূর্বে এক সুবিশাল বক্তব্য এবং তার পর অন্য এক বক্তব্য, মাঝখানে স্থান পেল বিদায় হজ্জের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা একটি বড় আয়াতের অংশ হিসেবে। আর সেই সুবিশাল আয়াত একটি সাধারণ খাদ্য আইন। কি বিস্ময়! অতএব, ১৭:১০৪ আয়াতকে পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে যদি পাঠ করা হয়, তবে এই আয়াতের ঘোরতর ঘোষণা যেন প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রিয় পাঠক, The Holy Quran, A. Yusuf Ali-র ভাষ্যে এ আয়াতের টীকা কিংবা অন্যান্য তফসিরে প্রদত্ত টীকা সমূহে যে টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করা যায় তার দিকে দৃষ্টি রেখে ১৭:১০৪ আয়াতকে একটি স্বাবলম্বী আয়াত হিসেবে পাঠ করার জন্য অনুরোধ করছি।
কোরআন প্রতিশ্রুত ফি-ই-ফা কী? لَفِيفً۬اফি-ই-ফা-এর (fayafin) আভিধানিক অর্থ মরুভূমি। কিন্তু (faifa / faifan) শব্দটির আরো সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করেছেন F. Steingass – dangerous desert কিংবা dangerous plain. সুতরাং ১৭:১০৪ আয়াতে বনি ইসরাঈলের একত্রিকরণের প্রতিশ্রুত বিষয়টি অবশ্যই একটি বিপজ্জনক একত্রিকরণ বা মূলত ইসরাঈল জাতির শেষ সর্বনাশের সঙ্গে জড়িত।
ইসরাঈলকে কেন ফি-ই-ফা -তে একত্রিত করা হবে যার একটি উপাদান তাদের ধ্বংস? এর উত্তরটি কোরআন দিয়েছে পরিষ্কারভাবে। বনি ইসরাঈল পৃথিবীতে দু’টি বড় আকারের ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে - এ বিষয়ে পূর্বেই তাদেরকে সাবধান করা হয়েছিলো যেন তারা সতর্কতার সঙ্গে ক্ষতি পরিহার করার সুঝোগ পায়। এর একটি ছিলো তৌরাত ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ও তৌরাতকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি এবং ফলশ্রুতিতে মূলত মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও একটি নতুন ধর্মের উন্মেষ “ইহুদিবাদ”। হজরত সুলায়মান (আঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর দুই সন্তান জেরিবোয়া ও রেহবোয়া ইসরাঈল সাম্রাজ্যকে জুডা ও ইসরাঈল এই দু’ই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। জুডার অন্তর্ভূক্ত হয় জেরুজালেম। জেরুজালেম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতে ইসরাঈল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নগর ‘সীচেম’কে খ্যাতি ও গুরুত্ব প্রদান করা ধর্মীয় খৃষ্টদের এক গুরুতর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তজ্জন্য তারা নিজ হস্তে তৌরাত পরিবর্তন শুরু করে এবং নকল তৌরাত বিধি অনুসারে ধর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ শুরু করে। এই ঘটনায় জুডা তথা জেরুজালেমকেন্দ্রিক রাবাইগণও তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে। দুইদলে তৌরাত পরিবর্তনের চলে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় খোদায়ী আইন মুছে যায় এবং মানুষের লিখিত আইন দ্বারা সমাজ, ধর্ম ও পৃথিবী ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত আজকের ইরাক দখল ও অন্যান্য ঘটনা সেদিনের সেই নকল তৌরাত মানুষের হাতে পরিবর্তন সাধনেরই এক বাস্তব ফসলের ক্ষেত্র চিত্র। যখন স্রষ্ট্রার কল্যাণময় আইন মানুষ কর্তৃক অবলুপ্ত করা হয় এবং মানবীয় আইন ও বিধান দ্বারা তা প্রতিস্থাপিত হয় - তখন এ ঘটনাগুলোকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ফ্যাসাদ। ফ্যাসাদ মূলত খোদায়ী আইনকে প্রতিরোধই করে না- বরং খোদার অস্তিত্বকে সৃষ্টি হতে মুছে ফেলার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রয়োগ করে।
বনি ইসরাঈল কর্তৃক দ্বিতীয় ফ্যাসাদটি সংঘটিত হয় হজরত ঈসা (আঃ)-কে অমান্যকরণ ও তাঁকে হত্যা করার ষড়যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। এই ঘটনার ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয় একটি শির্কবাদী ব্যবস্থা - খৃষ্টানবাদ। মূলত ইহুদি ও খৃষ্টান উভয়ের সীমামন্ডল ইসলাম ভিন্ন অন্য কিছুই হবার কথা ছিল না। যতদিন পর্যন্ত তারা তৌরাত অবলম্বন করেছিলো - তারা ছিল মুসলমান। নকল তৌরাত আবিষ্কারের মাধ্যমে তারা নতুন ধর্মের জন্ম দিয়েছে -যা হলো ইহুদিবাদ। এটি ছিলো প্রথম ফ্যাসাদ। পরবর্তী ফ্যাসাদ ছিলো তাদেরই অকল্যানের স্রোত প্রবাহে সৃষ্ট খৃষ্টানবাদ। উভয়বাদই মূলত ইসলামের সাক্ষাৎ বিরুদ্ধাচারণ এবং উভয়বাদের সর্বশেষ লক্ষ্য হলো পৃথিবী হতে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর আইনের অস্তিত্ব, তাঁর বাণীর অস্তিত্বকে পূর্ণভাবে অবলুপ্ত করে তাদের নিজ হাতে তৈরি করা আইনে পৃথিবী শাষন করা। আর এই উভয়বাদের বিরুদ্ধেই হলো কোরআনের আগমন।
কোরআনের বাস্তব প্রায়োগিক পদ্ধতি একজন রাসুল (সাঃ)-এর দ্বারা ব্যবহারিক বলয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ব্যবস্থায় কিভাবে যোগ্যতা ও কৃতকার্যতার সাথে কাজ করে, তার উদাহরণ সেই রাসুল (সাঃ) ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে কোন অতিপ্রাকৃতিক ব্যবস্থার আশ্রয় নেন নি। তিনি ছিলেন একজন রাসুল (সাঃ) যাঁর জীবন ছিল অন্যান্য সাধারণ মানুষেরই মত, ক্ষুধা, দুঃখ, যন্ত্রণা, অসুস্থতা, ব্যর্থতা, যুদ্ধ, শান্তি, জ্ঞান, শিক্ষা, বিনয় ইত্যাদি যা কিছু কল্পনা করা যায় অপরাপর মানুষের জীবনের জন্য- সেই সমস্ত ব্যবহারের সমষ্টিতেই। এমনি স্বাভাবিক ব্যবহার, প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনা করেই উৎসারিত হয়েছিল ইসলামের জীবন ব্যবস্থা। তারপর অর্ধ বিশ্ব বিজয় করেছিলো মুসলমান তাঁরই শেখানো পদ্ধতিতে। আল্লাহ্পাক এই রাসুলের (সাঃ) পদ্ধতিতেই ইসলামের বিজয় দেবেন এই প্রতিশ্রুতি করেছিলেন- “কাতাবাল্লাহু লাআগলিবান্না আনা ওয়া রাসুলী”- এই আয়াতে। বিজয় যখন অর্ধেক- তখন মুসলমান পথচ্যুত হল, পরিণামে পদচ্যুত হল। যদি বিপর্যয় আসে, মুক্তি কোন পথে তারও পদ্ধতি দেয়া হলো- ‘জিহাদ’। কিন্তু মুসলমান আর আল্লাহর সৈনিক হিসেবে নিজ অবস্থান রক্ষায় সমর্থ হলো না। যখন মুসলমান ব্যর্থ হলো- তখন দায়িত্ব চলে আসে স্বয়ং আল্লাহর; তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পূর্ণ বিজয়ের। যদি মুসলমান ব্যর্থ হয়ে যায়, তবে পরিণতিটির গতি প্রকৃতি কী হবে, তা-ও কোরআন ও হাদীছে বর্ণিত রয়েছে নিখুঁতভাবে। তারই ক্রমধারায় নেমে আসবে দু’টি ঘটনা বা ‘ফেনোম্যানন’ বা প্রপঞ্চ যার একটি দাজ্জাল এবং অপরটি ইয়াজুজ মা’জুজ। পৃথিবী দাজ্জালের ফিৎনায় ভেসে যাবে, ইসলাম ইয়াজুজ মা’জুজের হাতে মার খাবে। ইসলাম হতে জিহাদী চেতনা যখনই বিদায় নেবে, তখনই ইসলাম আক্রান্ত হবে এ দু’টি প্রপঞ্চ দ্বারা। মানুষ উদাসীন হতে হতে চরম সীমালংঘনকারী হয়ে যাবে- যা আজকের নিত্যদিনের দৃশ্য। আর দূর্ভাগ্যজনকভাবে সীমালংঘন উৎসবে যোগ দেবে মুসলমান। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও অনৈসলাম এ দুয়ের পার্থক্য বিলীন হয়ে পড়বে এ দু’টি আঘাতে। স্রষ্টার অস্তিত্ব, প্রত্যাবর্তন, স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আনুগত্য, ভয় ইত্যাদি বিলুপ্ত হবে। ইসলাম যতটুকু বেঁচে থাকবে - ইসলাম হিসেবে নয়, একটি স্মৃতি হিসেবে। ইসলামের মৌলিকতা হারিয়ে গিয়ে অমৌলিক বিবেচনা সমূহ হবে ঘোরতর বিবেব্য বিষয়। ইসলামের প্রকৃতি প্রাকৃতিক গতিতে হারিয়ে বসবে মুসলমান, তাকে ধরে রাখতে প্রয়াসী হবে না আর। আল্লাহ পাক স্বয়ং তাতে হস্তক্ষেপ করবেন। মুসলমানদের পরিণাম যখন অতি সংকটজনক হবে, আবির্ভাব হবে ইমাম মাহদী (আঃ) এবং তারপর হজরত ঈসা (আঃ) যিনি অকাতরে শেষনবী (সাঃ) উম্মত হবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। হজরত ঈসা (আঃ) এর আগমন ও তাঁর পরবর্তী ঘটনার ফলাফল হবে যে পৃথিবীতে ইসলাম ব্যতীত আর কোন মতবাদ থাকবে না। আল্লাহ পাকের প্রতিশ্রুতি পরিপূর্ণ হবে।
লেখকঃ দুর্বল হোসেন বাতাস
No comments